ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তি ‘দেশবিরোধী’ দাবি বিদ্যুৎ মন্ত্রীর: জাতীয় স্বার্থে সব চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা
বিদ্যুৎ আমদানি, মূল্য নির্ধারণ ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে তীব্র সমালোচনা; নতুন সরকার বলছে—জনস্বার্থ অগ্রাধিকারেই হবে সিদ্ধান্ত
তারিখ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ওয়েবসাইট: জনসেবা নিউজ
সম্পাদক: মোহাম্মদ জাকির হোসেন
ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলা হয়েছে, বিগত সরকারের সময় সম্পাদিত একাধিক বিদ্যুৎ চুক্তি দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। বিশেষ করে ভারতীয় বেসরকারি খাতের কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তিকে তিনি ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং এসব চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের ঘোষণা দেন।
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে মন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ চুক্তি শুধু অর্থনৈতিক লেনদেন নয়; এটি দেশের সার্বভৌমত্ব, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি সম্পাদনের সময় জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি, যা বর্তমান সরকারের কাছে পুনর্বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্ত্রী দাবি করেন, দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সিদ্ধান্ত প্রশ্নবিদ্ধ। তার বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও পরিকল্পনার অসামঞ্জস্য, কেন্দ্রগুলো অলস পড়ে থাকা এবং চুক্তির শর্তের কারণে আমদানি নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। তিনি ইঙ্গিত দেন, অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা যথাযথভাবে ব্যবহৃত হলে আমদানির প্রয়োজন অনেকাংশে কমানো সম্ভব ছিল।
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির মূল্য নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, যখন আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যুতের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম ছিল, তখন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা করা হয়। এতে করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও বলেন, চুক্তির মধ্যে এমন কিছু সূচক সংযোজন করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে মূল্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করে—এ বিষয়টিও পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো খতিয়ে দেখতে একটি কমিটি কাজ শুরু করেছে। ওই কমিটি বিদ্যমান চুক্তির আর্থিক, কারিগরি ও আইনগত দিক বিশ্লেষণ করে সুপারিশ দেবে। মন্ত্রীর ভাষ্য, ‘দেশ ও জনগণের স্বার্থের পরিপন্থী কোনো শর্ত থাকলে তা সংশোধন বা পুনরায় আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
তবে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমতও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলোর পক্ষে অবস্থান নেওয়া নেতারা বলছেন, বিদ্যুৎ আমদানি দেশের শিল্পায়ন ও নগরায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক ছিল। তাদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রক্রিয়া।
এদিকে জ্বালানি বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, বিদ্যুৎ আমদানিকে এককভাবে ‘দেশবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া বিষয়টিকে রাজনৈতিক মাত্রা দেয়। তারা বলেন, বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ, উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। যদি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় বেশি হয় বা অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা থাকে, তাহলে স্বল্পমূল্যে আমদানি যৌক্তিক হতে পারে। তবে চুক্তির স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, বিদ্যুৎ খাতের বকেয়া পরিশোধের চাপ এবং উচ্চমূল্যের চুক্তির কারণে আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তার দাবি, পূর্ববর্তী সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বড় অঙ্কের দায়ে জর্জরিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘যদি চুক্তিগুলো এতই লাভজনক হয়ে থাকে, তাহলে বিদ্যুৎ খাতে এত বকেয়া কেন জমেছে?’
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। সৌর ও বায়ু শক্তি উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো, এলএনজি আমদানিতে স্বচ্ছতা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়া হবে। তার মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী উৎস প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে জাতীয় স্বার্থের আলোকে।
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে মূল্য সূচক বা প্রাইসিং ফর্মুলা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কিছু চুক্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারের সূচকের সঙ্গে মূল্য সমন্বয়ের শর্ত রয়েছে। এতে করে বাজারদর কমলেও নির্দিষ্ট কাঠামোর কারণে আমদানিমূল্য তুলনামূলক বেশি থাকতে পারে। এই কাঠামো পুনর্বিবেচনার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকলেও বাস্তবে সব কেন্দ্র পূর্ণ ক্ষমতায় চালানো সম্ভব হয় না। জ্বালানি সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ, চাহিদার ওঠানামা এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা—এসব কারণে আমদানি কখনো কখনো ভারসাম্য রক্ষার ভূমিকা রাখে। তাই নীতিগত সিদ্ধান্তে বাস্তবতা বিবেচনা জরুরি।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্য কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত সম্পর্কের অংশও বটে। চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন অবশ্যই একটি সার্বভৌম সিদ্ধান্ত; তবে তা করতে হবে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে। হঠাৎ করে চুক্তি বাতিল বা আক্রমণাত্মক অবস্থান আঞ্চলিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।
মন্ত্রী অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার আলোচনা ও আইনি কাঠামোর মধ্য দিয়েই সমাধান খুঁজবে। ‘কেউ যদি আইন বা আদালতের আশ্রয় নেয়, আমরা সেটিও মোকাবিলা করব’—বলেন তিনি। তার ভাষায়, ‘জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব; প্রয়োজনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতেও আমরা প্রস্তুত।’
সার্বিকভাবে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি ইস্যুটি এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। একপক্ষ এটিকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করছে, অন্যপক্ষ বলছে—এটি ছিল বাস্তব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নেওয়া প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। তবে স্পষ্ট যে, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ও নীতিগত কাঠামো পুনর্বিন্যাস এখন সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা নির্ভর করছে চলমান পর্যালোচনা প্রক্রিয়া, আইনি বিশ্লেষণ এবং কূটনৈতিক আলোচনার ওপর। তবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার্বভৌমত্ব—এই তিনটি প্রশ্ন এখন জাতীয় আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। জনস্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের সমন্বয় ঘটিয়েই সরকারকে সামনে এগোতে হবে—এমন প্রত্যাশাই বিশ্লেষকদের।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন