অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: ‘এখন আর পারছি না’ — আব্দুল জব্বার মণ্ডল

 অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা: ‘এখন আর পারছি না’ — আব্দুল জব্বার মণ্ডল

জনসেবা নিউজ 

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬



অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব পালনকালে ঘনঘন অভিযানে অংশ নিয়ে ঘুষ ও অনিয়মে জড়িত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা স্বীকার করে এবার ক্লান্তির কথা জানালেন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার মণ্ডল। তিনি বলেছেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ঘনঘন তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। কিন্তু এখন আর পারছি না।” তার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।


২১ ফেব্রুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি পোস্টে আব্দুল জব্বার মণ্ডলের একটি ছবি এবং তার বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে তিনি ইঙ্গিত দেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে একাধিক অভিযানে অংশ নিতে হয়েছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, মজুতদারি ও ভেজাল পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছিল।


অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বাজার নিয়ন্ত্রণ ছিল অন্যতম অগ্রাধিকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যখন চাপে পড়ে, তখন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হয়। এসব অভিযানে অনেক ব্যবসায়ীকে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল কিংবা সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।


অভিযানগুলোর সময় বেশ কিছু বড় পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মূল্য আদায়, মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং নকল পণ্য বিক্রির অভিযোগ ওঠে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব ভাঙতে প্রশাসনিক চাপ প্রয়োজন ছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হয়।


তবে ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশ অভিযোগ করে, অনেক সময় অতিরিক্ত প্রশাসনিক চাপ ও হঠাৎ অভিযানের কারণে স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে। তারা দাবি করেন, সব ব্যবসায়ী অনিয়মে জড়িত নন; কিন্তু কয়েকজনের কারণে পুরো খাতকে কঠোর নজরদারির মধ্যে পড়তে হয়েছে।


আব্দুল জব্বার মণ্ডলের বক্তব্যে প্রশাসনিক ক্লান্তির একটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। টানা অভিযান, রাজনৈতিক পরিবর্তন, জনমতের চাপ—সব মিলিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ বেড়েছে। তিনি সরাসরি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কথা বলেননি; তবে তার বক্তব্যে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে।


একাধিক সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাজার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ফল দেখাতে উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা ছিল। ফলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিন-রাত কাজ করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত জনবল বা লজিস্টিক সাপোর্ট ছাড়াই অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছে।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পর দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একপক্ষ বলছে, একজন কর্মকর্তা যদি প্রকাশ্যে এমন মন্তব্য করেন, তাহলে তা প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। অন্যপক্ষের মতে, বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার জন্য তাকে দোষারোপ করা উচিত নয়।


কিছু ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, বাজারে এখনও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিক। যদি অভিযান শিথিল হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। আবার কেউ কেউ বলছেন, কেবল অভিযান নয়—দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কার ছাড়া বাজারে স্থায়ী শৃঙ্খলা আসবে না।


ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, নিয়মিত অভিযান এখনও চলছে এবং চলবে। ব্যক্তিগত মন্তব্যকে প্রতিষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বাজারে শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানানো হয়।


অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজার নিয়ন্ত্রণ কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান আসে না। সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি-রপ্তানি নীতির ভারসাম্য এবং বাজার মনিটরিংয়ের আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।


অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাজারে অস্থিরতা কমাতে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে ছিল— জেলা পর্যায়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, পাইকারি বাজারে নিয়মিত মনিটরিং, মূল্য তালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করা, ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার এবং জরিমানার পরিমাণ বৃদ্ধি। এসব পদক্ষেপের ফলে কিছু সময়ের জন্য বাজারে স্বস্তি ফিরে এলেও তা স্থায়ী হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।


বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাজার নিয়ন্ত্রণের বড় চ্যালেঞ্জ হলো—সরবরাহ চেইনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট ভাঙা এবং ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। শুধু অভিযান নয়, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ ও যৌথ কর্মপরিকল্পনাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।


একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং সিস্টেম চালু করা গেলে বাজারে মূল্য কারসাজি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। ই-মনিটরিং, ডাটাবেইস ভিত্তিক মূল্য বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল রসিদ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছতা বাড়ানো যেতে পারে।


সবশেষে বলা যায়, আব্দুল জব্বার মণ্ডলের বক্তব্য একটি বড় বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করছে—মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর চাপ এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের জটিলতা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কঠোর অভিযান চালিয়ে অনিয়ম দমনের চেষ্টা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, স্বচ্ছতা এবং টেকসই সংস্কার। বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়; ব্যবসায়ী, ভোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগেই স্থিতিশীলতা আসতে পারে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন ঘোষণা: বাবুগঞ্জের ১ নং বিরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নে নতুন নির্বাচনী সমীকরণ

পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজির অভিযোগ: প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি টাকার অবৈধ আদায়ের দাবি, কতটা সত্য?

থানায় লিখিত অভিযোগ মির্জাগঞ্জ এ ব্যবসায়ীর কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ, বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে