পিরোজপুরে বিএনপির ৫ নেতাকর্মীকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য আ.লীগ নেতার
জনসেবা নিউজ রাজনীতি | দেশজুড়ে
প্রকাশিত: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রিপোর্টার: বিশেষ প্রতিনিধি মোহাম্মদ জাকির হোসেন
সংক্ষিপ্ত বিবরণ:
পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলায় বিএনপির পাঁচ নেতাকর্মীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। আহতরা দাবি করেছেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছেন। তবে অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ঘটনাটি ঘিরে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বিস্তারিত:
পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী উপজেলায় রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে বিএনপির পাঁচ নেতাকর্মীকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে উপজেলার পত্তাশী ইউনিয়নের বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন—মো. নজরুল ইসলাম ফকির (৫৫), যিনি বিএনপির নেতা ও পত্তাশী ইউনিয়ন মৎস্যজীবী দলের সভাপতি; জাহিদ হোসেন (৩৮), স্বেচ্ছাসেবক দলের ইউনিয়ন সভাপতি; মো. নাহিদ হোসেন (১৮); ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নাজির উদ্দিন ফকির (৫০); এবং নাঈম হোসেন (২৮)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনাস্থল ছিল বাজারসংলগ্ন একটি সেতুর পাশের এলাকা। রাত সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন সেখানে ছুটে যান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে কয়েকজনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। আহতদের মধ্যে দুজন অচেতন ছিলেন বলে জানা গেছে।
পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের ইন্দুরকানী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে আহতরা জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
আহত জাহিদ হোসেন ও নাজির উদ্দিন ফকির অভিযোগ করেন, হামলায় নেতৃত্ব দেন পত্তাশী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নাসির উদ্দিন টুকু। তার সঙ্গে ছিলেন তার ছেলে রায়হান, টুকুর ভাই যুবলীগ নেতা আলাউদ্দিনসহ ৮-১০ জন। তারা দাবি করেন, বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় তাদের ওপর এই হামলা চালানো হয়েছে।
আহতদের ভাষ্য অনুযায়ী, “আমরা রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই চাপের মধ্যে ছিলাম। ওই রাতে পরিকল্পিতভাবে আমাদের ওপর হামলা চালানো হয়।” তারা বলেন, হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর চড়াও হয়।
তবে অভিযুক্ত নাসির উদ্দিন টুকু অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি মারামারি থামাতে গিয়েছিলাম। উল্টো আমিই আহত হয়েছি। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে।” তার দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে জড়ানোর চেষ্টা করছে।
ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামীম হাওলাদার বলেন, আহতরা বর্তমানে জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তিনি জানান, ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাজার এলাকা সাধারণত সন্ধ্যার পরও সরগরম থাকে। এমন একটি জনবহুল স্থানে এ ধরনের হামলা এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা অনেক সময় ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের সঙ্গে মিশে সহিংসতায় রূপ নেয়। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার, দলীয় আধিপত্য ও সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনের প্রশ্নে সংঘাতের ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দলীয় সহিংসতার অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, ভাঙচুর কিংবা পাল্টাপাল্টি অভিযোগের ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে তদন্ত ছাড়া কোনো পক্ষকে দোষী বলা যায় না। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন জরুরি।
মানবাধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর হামলা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত। মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণের অধিকার সুরক্ষিত রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এদিকে ঘটনাটির পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সামনে নির্বাচন বা বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকেও সংযত আচরণ করতে হবে।
সব মিলিয়ে পিরোজপুরের ইন্দুরকানীর এই ঘটনা আবারও স্থানীয় রাজনীতিতে সহনশীলতা ও আইনের শাসনের গুরুত্ব সামনে এনে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্তে কী উঠে আসে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়।
© ২০২৬ janasheba.news | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন